সাকিল সৈকত

প্রকাশিত: ০৫ আগষ্ট ২০২৬ , ০৮:৪৫ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

আরব বসন্ত থেকে সিজেপি: তরুণদের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট

একুশ শতকের গণআন্দোলনের ইতিহাসে ২০১০-১১ সালের আরব বসন্ত একটি বাঁক-বদলের মুহূর্ত। তিউনিসিয়ার এক ফল বিক্রেতার আত্মহুতি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া ছাড়িয়ে পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। দেড় দশক পর ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একই রকম তবে ভিন্ন প্রজন্মগত ও প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা ‘জেনজি আন্দোলন’ ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশ, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ভারতের "ককরোচ জনতা পার্টি" পর্যন্ত। এই আন্দোলনগুলোর প্রকৃতি, চালিকাশক্তি ও তাদের মধ্যকার সাদৃশ্য যেমন দৃশ্যমান তেমনি এর বৈসাদৃশ্যও চোখে পড়ার মতো। যেমন ভারতের জেনজি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব স্থিমিত হয়ে পড়ে।  

বিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জেনারেশন জি বা জেনজি-নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রবাহতে প্রতীয়মান হয় ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক অসমতা ও স্বৈরাচারী শাসনের নানা দিক। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে গড়ে উঠা কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে রূপান্তরিত জুলাই বিপ্লবকে বিশ্বব্যাপী প্রথম সফল জেনজি বিপ্লব বলে বিবেচনা করা হয়। এবং এ ধরণের আন্দোলন পরবর্তীতে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, পূর্ব তিমুর ও মালদ্বীপে ব্যপক প্রভাব বিস্তার করে।

২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কাঠমান্ডুর মাইতিঘর মণ্ডলায় জড়ো হওয়া তরুণরা সংসদ ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যায়, যা পরে সহিংস রূপ নেয়। আন্দোলনের চাপে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী করা হয় এবং ২০২৬ সালের মার্চে নির্বাচন ঘোষণা করা হয়।

একই সময়ে অর্থনৈতিক সংকট ও শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে তরুণ-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দেখা যায় শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায়। যদিও এর তীব্রতা ও পরিণতি ভিন্ন ভিন্ন ছিল।

এই আন্দোলনগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো-এগুলো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বা ইউনিয়নের নেতৃত্বে নয়, বরং টিকটক, ডিসকর্ড, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা তরুণ সংগঠকদের হাতে পরিচালিত হয়েছে। শক্তিশালী গণজাগরণ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এই আন্দোলন-উত্তর সরকারগুলো স্থিতিশীল শাসন প্রতিষ্ঠায় কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে।

২০২৬ সালের ১৬ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। যেখানে অভিযোগ ওঠে তিনি বেকার তরুণদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছেন-যদিও পরে বিচারপতি নিজে জানান তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। এই বিতর্কিত মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করেই জন্ম নেয় "ককরোচ জনতা পার্টি" (সংক্ষেপে সিজেপি)।

এর প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে, যিনি আগে আম আদমি পার্টির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছেন। মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে তিনি ৬ জুন দেশে ফেরেন।

আন্দোলনটির ডিজিটাল বিস্তার ছিল বিস্ময়কর। এ আন্দোলন শুরুর ৭৮ ঘণ্টার মধ্যেই এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ৩০ লক্ষ অনুসারী অতিক্রম করে এবং পাঁচ দিনের মধ্যে তা ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এমনকি বিজেপির অফিসিয়াল হ্যান্ডেলকেও ছাড়িয়ে যায় এটি।  

নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবকদের সমর্থনে সিজেপি দিল্লির যন্তরমন্তর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘিরে বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন। পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও সিজেপির ডাকা বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন, যদিও পরে তাঁদের সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আটক করা হয়। 

আরব বসন্ত থেকে সিজেপি পর্যন্ত এই দেড় দশকের যাত্রায় কিছু অভিন্ন কাঠামোগত সুত্র লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, উচ্চ বেকারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের সমন্বয় আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফেসবুক-টুইটার-নির্ভর আরব বসন্ত থেকে টিকটক ইনস্টাগ্রাম-নির্ভর এশিয়ার আন্দোলন হয়ে সিজেপির ইনস্টাগ্রাম-এক্স-কেন্দ্রিক উত্থান-প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু সংগঠনের মূল যুক্তি একই রয়ে গেছে।

মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মহুতি যেমন আরব বসন্তের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনই বিচারপতির একটি মন্তব্য বা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস সিজেপির ক্ষেত্রে অনুরূপ প্রতীকী ট্রিগার-পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। আরব বিশ্বে যেখানে অনেক রাষ্ট্র দমননীতি বা যুদ্ধে গড়িয়েছিল, এশিয়ার সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে (নেপাল, ভারত) তুলনামূলকভাবে দ্রুত আংশিক সমঝোতা বা মন্ত্রী পদত্যাগের মতো ফলাফল দেখা গেছে- যা ইঙ্গিত দেয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থাকা রাষ্ট্রগুলো আন্দোলনের চাপে দ্রুত নমনীয় হতে বাধ্য হয়, যদিও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত হয় কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকে।

আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষা আন্দোলনের বিস্ফোরক সাফল্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের নিশ্চয়তা দেয় না। নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জেনজি আন্দোলন-উত্তর সরকারগুলো কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে।  

আরব বসন্ত থেকে এশিয়ার জেনজি আন্দোলন এবং ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি-এই তিনটি অধ্যায় একসূত্রে বিচার করলে দেখা যায়, একুশ শতকের গণআন্দোলন ক্রমশ কেন্দ্রীভূত দলীয় কাঠামো থেকে সরে গিয়ে বিকেন্দ্রীভূত, ডিজিটাল-নেটিভ ও সাংস্কৃতিকভাবে উদ্ভাবনী (হাস্যরস, মিম, ব্যঙ্গ) রূপ নিচ্ছে। তবে কাঠামোগত পূর্বশর্তগুলো— তরুণ বেকারত্ব, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস- একই রয়ে গেছে।  

তবে ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলন ২০২৬ সালে বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে জন্ম নেয়-বহু ক্ষেত্রে এই প্যাটার্নের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তার গতিপথ, ভাষা ও পরিণতি লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন। কারণ ভারত একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংবিধানিক গণতন্ত্র, যেখানে নির্বাচিত সরকার, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও একটি কার্যকর সংসদীয় বিরোধী দল বিদ্যমান। ফলে সিজেপির আন্দোলন কখনোই "সরকার হটাও" বা "রেজিম চেঞ্জ"-এর স্লোগানে রূপ নেয়নি-বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট দাবি (প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ) নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেছিল।   

আরব বসন্ত ও এশিয়ার জেনজি আন্দোলনের দাবিগুলো ছিল ব্যাপ্ত ও সামগ্রিক-শাসকের পদত্যাগ, নতুন সংবিধান, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন। নেপালে যেমন পুরো মন্ত্রিসভা ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবি উঠেছিল, বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবে রাষ্ট্রপ্রধানের পতন হয়েছিল। বিপরীতে সিজেপির দাবি ছিল সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক-নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার লিখিতভাবে আশ্বাস দেয় যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না, সংসদে পরীক্ষা সংস্কারের বিষয় উত্থাপন করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ বিবেচনা করা হবে। এই আলোচনা-ভিত্তিক প্রতিক্রিয়াই আন্দোলনকে সহিংস সংঘাতের দিকে না গিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সাহায্য করে। এটি রাজনৈতিক সুযোগ কাঠামো তত্ত্বের একটি বিপরীত প্রয়োগ-এখানে রাষ্ট্র নিজেই সুযোগ তৈরি না করে বরং সুযোগ সীমিত রেখে আন্দোলনকে শান্ত করার কৌশল নিয়েছে।

ভারতে সিজেপি সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেনি, বরং বিদ্যমান সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর (কংগ্রেস নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সংহতি প্রদর্শন) সঙ্গে সমান্তরালভাবে কাজ করেছে, যদিও নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখে। এতে প্রমাণ হয় ভারতের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোতে নতুন আন্দোলন পুরনো ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন না করে তার সঙ্গে "জোটবদ্ধ সহাবস্থান" তৈরি করতে পারে-একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা সাধারণত সম্ভব হয় না।

আরব বসন্ত ও এশিয়ার জেনজি আন্দোলনের পরিণতি ছিল সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় রূপান্তর-রাষ্ট্রপ্রধানের পতন, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই সামগ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতাও এসেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে দক্ষিণ এশিয়ার জেনজি আন্দোলন-উত্তর সরকারগুলোর সামনে এখন কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

সিজেপির পরিণতি ছিল তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ কিন্তু সুনির্দিষ্ট বিজয়— একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ, তদন্তের প্রতিশ্রুতি ও ক্ষতিপূরণ আলোচনা, এবং সরকারের কাঠামো অক্ষত রাখা। এই "আংশিক জয়" মডেলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি এবং আন্দোলনও নিজের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দেয়নি— বরং এটি ভবিষ্যতে একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে টিকে থেকেছে।  

একনায়কতান্ত্রিক বা সদ্য-ভঙ্গুর রাষ্ট্রে আন্দোলন যেখানে অনিবার্যভাবে সামগ্রিক রূপান্তর বা সহিংস সংঘাতের দিকে গড়ায়, প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক গণতন্ত্রে তা সুনির্দিষ্ট দাবি, আলোচনাসাপেক্ষ সমঝোতা ও প্রতীকী-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের রূপ নিতে পারে।

লেখক: নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী